স্যাটেলাইট গবেষণায় ১৯৮৭–২০২৫ সময়ে পদ্মার ব্যাপক ভাঙন-চর জাগরণ; পর্যাপ্ত উজানের পানিনিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পানি আইনের আওতায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করার দাবি
পদ্মা বাংলাদেশের জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু এই নদীর বর্তমান চিত্র শুধু একটি নদীর স্বাভাবিক ভাঙন-গড়নের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ, পলি পরিবহন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আন্তঃসীমান্ত পানি-নিরাপত্তার প্রশ্ন।
গোদাগাড়ী থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত উচ্চ পদ্মার ওপর ১৯৮৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় নদীর এই পরিবর্তনশীল চরিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ৩৮টি শুষ্ক মৌসুমের Landsat স্যাটেলাইট চিত্র, GISভিত্তিক স্থানিক বিশ্লেষণ এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পানি প্রবাহের তথ্য ব্যবহার করে গবেষণায় প্রায় চার দশকের নদীভাঙন, পলি সঞ্চয় ও নদীপথ পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই সময়ে প্রায়১,৮১১.৩৮ বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয়েরশিকার হয়েছে, বিপরীতে প্রায়১,৮৯৭.২৩ বর্গকিলোমিটার ভূমিতে পলি সঞ্চয়হয়েছে। অর্থাৎমোটহিসাবেপ্রায়৮৫.৮৫ বর্গকিলোমিটার নিট ভূমি বৃদ্ধিঘটেছে। কিন্তু এই নিট বৃদ্ধির অর্থ পদ্মা স্থিতিশীল হয়েছে, এমনটি নয়। বরং বিপুল পরিমাণ ভূমি এক স্থান থেকে ক্ষয় হয়ে অন্যত্র গিয়ে জমা হয়েছে।গড়ে বছরে প্রায় ৫০ বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয় এবং ৫৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি সঞ্চয়ের এই চিত্র পদ্মার অসাধারণ গতিশীলতাকে প্রকাশ করে।
পানি কমলে নদীও বদলে যায়
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নদীর পানিপ্রবাহ ও নদীর আকৃতির পরিবর্তনের সম্পর্ক। বেশি প্রবাহ সাধারণত বেশি ক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু গবেষণায় এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে যেখানে মাঝারি প্রবাহের সময় উল্লেখযোগ্য ক্ষয় ও পলি সঞ্চয় ঘটেছে।এর অর্থ, পদ্মার পরিবর্তন শুধু পানির পরিমাণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। নদীর তলদেশের আকৃতি, পলির পরিমাণ, তীরের মাটির প্রকৃতি, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, চর গঠন এবং পূর্ববর্তী নদীপথ, সবকিছু মিলেই নদীর আচরণ নির্ধারণ করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পর্যাপ্ত উজানের পানিরএর গুরুত্ব কম। বরং একটি নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের গতিপ্রকৃতিও পলিপ্রবাহ ও তলানির বিন্যাসবজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উজানে প্রবাহের পরিমাণ ও মৌসুমি বণ্টন পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব নিম্নধারার নদীর প্রবাহ, পলি পরিবহন, নাব্যতা, চর গঠন এবং তীরের স্থিতিশীলতায় পড়তে পারে।
ফারাক্কা শুধু পানি বণ্টনের প্রশ্ন নয়
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর গঙ্গার পানি ভাগাভাগি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে দুই দেশ গঙ্গা/গঙ্গেসের পানি ফারাক্কায় ভাগাভাগির জন্য ৩০ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, চুক্তিতে বাংলাদেশকে গড়ে ৩০,০০০ ঘনমিটার/সেকেন্ড পানি দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই।চুক্তিতে পানি প্রবাহের একক হিসেবে cusec ব্যবহৃত হয়েছে এবং ফারাক্কায় প্রাপ্য প্রবাহ অনুযায়ী ভাগ নির্ধারণ করা হয়েছে।
চুক্তির Annexure-I অনুযায়ী, ফারাক্কায় প্রবাহ ৭০,০০০ cusec বা কম হলে দুই দেশ ৫০:৫০ হারে পানি পাবে; ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ cusec হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ cusec; আর ৭৫,০০০ cusec বা তার বেশি হলে ভারত ৪০,০০০ cusec পাবে এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পাবে। মার্চের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত নির্দিষ্ট তিনটি দশদিনের পর্যায়ে উভয় দেশের জন্য ৩৫,০০০ cusec করে পানি পাওয়ার গ্যারান্টির ব্যবস্থাও রয়েছে।
অতএব, গবেষণায় পাওয়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দীর্ঘমেয়াদি গড় প্রবাহকে সরাসরি চুক্তির বরাদ্দের সঙ্গে তুলনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না। তবে গবেষণায় প্রায়৫,০০০ ঘনমিটার/সেকেন্ডের দীর্ঘমেয়াদি গড় প্রবাহপাওয়া গেলে তা উচ্চ পদ্মার সামগ্রিক জলপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবৈজ্ঞানিক সূচকহিসেবে বিবেচনা করা যায়।
পদ্মার পরিবর্তন একটি সতর্কবার্তা
গবেষণার চার দশকের পরিবর্তন দেখলে স্পষ্ট হয়, পদ্মার নদীপথ কোনো স্থির রেখা নয়।কখনো নদী প্রশস্ত হয়েছে, কখনো সংকুচিত হয়েছে। কোথাও নতুন চর জেগেছে, কোথাও পুরোনো ভূমি বিলীন হয়েছে। ২০০৫ সালের দিকে নদী তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত ও জটিল চ্যানেল কাঠামো ধারণ করেছিল। আবার ২০১৫ সালের পর কিছু অংশে নদী সংকুচিত ও অপেক্ষাকৃত সরল হয়েছে। ২০২০–২০২১ সালেও তীব্র ক্ষয়ের ঘটনা দেখা গেছে।অর্থাৎপদ্মাএকটিপরিবর্তনশীল নদী, যেখানে পানি ও পলি ক্রমাগত নদীর আকৃতি পুনর্গঠন করছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উজান থেকে প্রবাহ কমে গেলে এর প্রভাব শুধু সেচের পানিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে কম প্রবাহ নদীর নাব্যতা, মৎস্যসম্পদ, পলি পরিবহন, নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতান্ত্রিক সংযোগএবং নিম্নধারারপরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহব্যবস্থা পরিবর্তিত হলে নদীর গঠনেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে নদীভাঙন, চর গঠন ও নদীপথ পরিবর্তনের ঝুঁকি নতুনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে।
এই কারণে ফারাক্কাকে শুধু ‘কত পানি পেল বাংলাদেশ’, এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, গঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থার জন্য কতটুকু পানি, কোন মৌসুমে এবং কী ধরনের প্রবাহব্যবস্থা প্রয়োজন?
১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের পানি কনভেনশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়টিও এখন নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।United Nations Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses, ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত এবং ২০১৪ সালে কার্যকর হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি। বর্তমানে এর ৪২টি রাষ্ট্র পক্ষভুক্ত।
এই কনভেনশনের দুটি মৌলিক নীতি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, equitable and reasonable utilization, অর্থাৎআন্তর্জাতিকনদীরন্যায়সংগতওযুক্তিসঙ্গতব্যবহার; এবং no significant harm, অর্থাৎকোনোরাষ্ট্রেরকর্মকাণ্ডেরমাধ্যমেঅন্যপানি, অংশীদাররাষ্ট্রেরওপরউল্লেখযোগ্যক্ষতিনাকরা।এ ছাড়া কনভেনশন আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশ এখনো ১৯৯৭ সালের এই কনভেনশনের পক্ষভুক্ত নয়। জাতিসংঘের বর্তমান চুক্তির পরিস্থিতিতেএ ৪২টি পক্ষের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই।তাই বাংলাদেশের উচিত প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেযত দ্রুত সম্ভব এই কনভেনশনে যোগ দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা।এটি একাই ভারত-বাংলাদেশ পানি সমস্যার সমাধান করবে না। তবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ব্যবহার, উল্লেখযোগ্য ক্ষতি প্রতিরোধ ও সহযোগিতার নীতিকে আরও সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি দিতে পারে।
নতুন গঙ্গা চুক্তিতে প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
১৯৯৬ সালের চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। তাই নতুন চুক্তি বা নবায়নের আলোচনায় শুধু পানি ভাগাভাগির একটি সংখ্যা নির্ধারণ করলেই হবে না।
প্রয়োজন হতে পারে-
• বাস্তবসম্মত ও হালনাগাদ hydrological তথ্য;
• শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত বাস্তুসংস্থানগত পানির প্রবাহ;
• যৌথ ও স্বচ্ছ পানি পরিমাপ;
• পলি পরিবহন ও পলি ভারসাম্যবিবেচনা;
• নদীর বাস্তুসংস্থানগত চাহিদা;
• জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব;
• উজান থেকে পানি হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়ার ফলে সৃষ্ট সামগ্রিক বা পঞ্জীভূত প্রভাব;
• তক্ষণাৎউপাত্তশেয়ারকরাএবং
• পুরো গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা।
পদ্মার বার্তা
চার দশকের স্যাটেলাইট গবেষণা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরে, পদ্মা স্থির নয়; এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
প্রায় ১,৮১১ বর্গকিলোমিটার ভূমিক্ষয় এবং ১,৮৯৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি সঞ্চয়ের এই বিশাল পরিমাণ পরিবর্তন দেখায়, নদীর পানি, পলি ও নদীপথের মধ্যে সম্পর্ক কতটা গভীর।বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন শুধু নদীভাঙন ঠেকানোর প্রকল্প নয়; প্রয়োজনপর্যাপ্ত উজানের পানির, বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতি।
ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি নিয়ে আসন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দাবি করা নয়; বরংগঙ্গা-পদ্মা নদী ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুতান্ত্রিক টেকসইতা, জলবৈজ্ঞানিক বা পানিসংক্রান্ত টেকসইতাএবংভূ-রূপগত টেকসইতানিশ্চিত করা।আর সেই পথকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে দ্রুত১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহ কনভেনশনের পক্ষভুক্ত হওয়ার উদ্যোগনেওয়া উচিত।
কারণ পানি কমলে শুধু নদী শুকায় না, নদীর চরিত্র বদলায়, পরিবেশ বদলায়, অর্থনীতি বদলায় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনও বদলে যায়।
ড: প্রকৌ: মো: জাকির হোসেন খান, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি, নাটোর।