প্রতিবছর ঈদ আসে আনন্দ, পুনর্মিলন ও ভালোবাসার বার্তা নিয়ে। দূর শহরে কর্মব্যস্ত মানুষগুলো অপেক্ষা করে প্রিয়জনের মুখ দেখার জন্য। শিশুরা নতুন জামা হাতে বাবার ফেরার প্রতীক্ষায় থাকে, বৃদ্ধ মা দরজার পাশে বসে থাকেন সন্তানের ফিরে আসার আশায়। কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঈদ যেন বারবার আরেকটি পুনরাবৃত্ত শোকের নাম হয়েও ওঠে।
সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখি বাস খাদে পড়েছে, ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ গেছে পুরো পরিবারের, লঞ্চডুবিতে নিখোঁজ শিশু, কিংবা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণরত তরুণের মৃত্যু। একটি আনন্দময় যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয় কান্না ও আর্তনাদের দীর্ঘ মিছিলে। রাষ্ট্র ও সমাজ এই ঘটনাগুলোকে দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করলেও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলো “কাঠামোগত সহিংসতা” (Structural Violence)-এর বহিঃপ্রকাশ।
কাঠামোগত সহিংসতা বলতে এমন এক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকে বোঝায়, যেখানে মানুষের মৃত্যু বা দুর্ভোগ কোনো ব্যক্তিগত ভুলের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বৈষম্য, দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল। ঈদযাত্রার সময় যে মৃত্যুগুলো ঘটে, তার পেছনেও রয়েছে সেই কাঠামোগত বাস্তবতা। অতিরিক্ত যাত্রীবহন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, দুর্বল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, চালকদের অমানবিক কর্মঘণ্টা এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ঈদ শুধু উৎসব নয়; এটি পরিবারে ফিরে যাওয়ার এক গভীর সামাজিক ও আবেগিক বাধ্যবাধকতা। ঢাকা কিংবা অন্যান্য নগরে কাজ করা মানুষ বছরের অধিকাংশ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। ফলে ঈদের আগে যেকোনো মূল্যে বাড়ি ফেরার প্রবল সামাজিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপকে পরিবহন মালিক, টিকিট সিন্ডিকেট এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষ জানে ঝুঁকি আছে, তবুও বিকল্প না থাকায় সেই ঝুঁকিকেই নিয়তির মতো মেনে নিতে বাধ্য হয়।
নৃতত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, কোনো সমাজে কোন মৃত্যু স্বাভাবিক আর কোন মৃত্যু অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হবে, তা সামাজিকভাবে নির্মিত (Social Construction)। বাংলাদেশে ঈদযাত্রার মৃত্যুকে আমরা এতটাই নিয়মিতভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এটি যেন এক প্রকার স্বাভাবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন সংবাদে আলোচনা হয়, কিছু ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়, তারপর আবার সব আগের মতো চলতে থাকে। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ যখন মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সমাজের বিবেকও ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুগুলো কি সত্যিই অনিবার্য? উত্তর হলো, না। উন্নত পরিকল্পনা, নিরাপদ গণপরিবহন, কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের মানবিক কর্মপরিবেশ এবং জবাবদিহিমূলক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই মৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই ঈদযাত্রার এই প্রাণহানিকে দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া আসলে কাঠামোগত ব্যর্থতাকে আড়াল করার শামিল।
ঈদের সময় মানুষ ঘরে ফেরে ভালোবাসার টানে। কিন্তু সেই যাত্রা যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তবুও আশার জায়গা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমরা চাই, এবারের ঈদযাত্রা হোক আতঙ্ক ও ট্র্যাজেডিমুক্ত, নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও মানবিক। মানুষ যেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নয়, নিশ্চিন্ত মনে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারে।
মো. মুসফিকুর রহমান জনি, উন্নয়ন গবেষক