• ঢাকা, বাংলাদেশ সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
জেলা পুলিশের অভিযানে ১৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ২ বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ১৩তম সভা নগরীতে ৩০ লাখ টাকার বেশি বায়না দিয়েও ভূমিদস্যু অপপ্রচারের অভিযোগ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজশাহী মহানগর বিএনপির প্রস্তুতি সভা রাজশাহীতে বেকারি মালিকদের জন্য বিশেষ ছাড়ে মেশিনারিজ দেবে কিট্ ফাষ্ট বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত রাজশাহীতে বরেন্দ্র শিশু থিয়েটারের বর্ষপূর্তি পল্টন ট্র্যাজেডির বিচার দাবীতে রাজশাহীতে জামায়াতের বিক্ষোভ রাজশাহী কালচারাল একাডেমির পরিচালকের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন শহরের সৌন্দর্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

কম বয়সে বিয়ে যেন সামাজিক প্রতিযোগিতা

আহসান হাবীব অপু
সর্বশেষ: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
রাজশাহীর চর আষাড়িয়াদহে বাল্যবিয়ে থামছেই না

রাজশাহীর চর আষাড়িয়াদহে বাল্যবিয়ে থামছেই না

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে বাল্যবিয়ে শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি অনেকটা সামাজিক অবৈধ প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মেয়ের বয়স ১৫ বছর পার হওয়ার পরও বিয়ে না হলে অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কার মেয়ের বিয়ে কত কম বয়সে হচ্ছে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রায় সব পরিবারই মানসিকভাবে কিশোরী বয়সেই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চাপে পড়ে। আর এসব বন্ধে কার্যকর তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনা। স্থানীয় প্রশাসনও চরের এই বিয়ে বন্ধে তেমন একটা তৎপর নয়। প্রায় ৩৬ দশমিক ৭৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে শিক্ষার সুযোগ সীমিত। পুরো এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ের মাত্র দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে একটি নিম্ন মাধ্যমিক এবং অন্যটি উচ্চ বিদ্যালয়। কোনো কলেজ নেই। এমনকি আলাদা কোনো বালিকা বিদ্যালয়ও নেই। শিক্ষা অবকাঠামোর এই সংকটকে সচেতন স্থানীয়রা বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।

কানাপাড়া এলাকার উচ্চ বিদ্যালয়ে ওই গ্রামের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে সহজে যাতায়াত করতে পারলেও ইউনিয়নের অন্য গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেক দূর হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। কোনো কোনো গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব সাড়ে তিন থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত। মেয়েদের জন্য এই পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে এই ইউনিয়নের বেশিরভাগ মেয়েই পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনার সুযোগ পায় না। কেউ কেউ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে। হাতে গোনা কয়েকজন দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ এলাকার মেয়েদের শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ অর্জন সাধারণত এসএসসি পাস। আবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হলেও নদী পার হয়ে প্রেমতলী এলাকায় যেতে হয়। এই কারণেও অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা না দিয়েই লেখাপড়া ছেড়ে দেয়।

অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, মেয়ে যদি বাড়িতে বসে থাকে, তাহলে পরে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে না। ভয় আছে মেয়ের কখনো কোন কোনো বদনাম ছড়িয়ে পড়লে বিপদে পড়বেন। তাই লেখাপড়া চলাকালেই মেয়ের বিয়ে দেওয়াকে তারা নিরাপদ সিদ্ধান্ত মনে করেন। এর ফলেই ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রায় সব মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একই ঘটনা ঘটছে, তাই কেউ এটিকে অস্বাভাবিক বলেও মনে করেন না।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের আকলিমা খাতুনের (ছদ্দ নাম) বিয়ে দেওয়া হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে। তার বাবা আব্দুল জলিল (ছদ্দ নাম) মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে বললেন, এই এলাকার সবাই ছোট থাকতে মেয়েদের বিয়ে দেয়। একটু বড় হয়ে গেলে ভালো সম্বন্ধ পাওয়া মুশকিল হয়। তাই আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি। ভালো একটি সম্বন্ধ এসেছিল, সেজন্য মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আমার আত্মীয়-স্বজনদের অনেক মেয়েকেও ছোট বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা ভালো আছে, সংসার করছে।

মানিকচক এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম (ছদ্দ নাম) মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ১৩ বছর বয়সে। তার যুক্তিও প্রায় একই। তিনি বলেন, মেয়ে বড় হয়ে গেলে বিয়ে দিতে নানা ধরনের সমস্যা হয় এবং ভালো সম্বন্ধ পাওয়া যায় না। বিয়ে দিতে তখন ঝামেলাও হয়। তাই ভালো ঘরের সম্বন্ধ পেলে মেয়ের বয়স কম হলেও বিয়ে দিয়ে দিই। এতে মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে হয়।

একই ইউনিয়নের কানাপাড়া এলাকার কালু মন্ডল বলেন, আমার এলাকায় সবাই অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। সেভাবে দেখে আমার মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল না, এটা নিয়েও আমার টেনশন ছিল। বয়স একটু বেশি হলে ভালো ঘর থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসে না। তাই ছোট থাকতেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। এই এলাকায় মেয়েদের পড়াশোনারও তেমন সুযোগ নেই। মেয়েকে বাসায় বসিয়ে রেখে আমি কী করবো? আবার কখন কোন ঝামেলা হয় , বদনাম একবার হলেতো আর কেউ পাশে দাঁড়াবে না।

নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চরাঞ্চলে ভালো রাস্তাঘাট নেই, বিদ্যুৎ নেই। পুরো এলাকা ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন। ফলে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বেশি। অনেকের বিশ্বাস, বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েরা স্বামীর পরিবারের নিরাপত্তায় থাকবে। এই ধারণাও বাল্যবিয়েকে উৎসাহিত করছে।

দারিদ্র্যও একটি বড় কারণ। অনেক পরিবার মেয়ের পড়াশোনা, পোশাক, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হিমশিম খান। ফলে বিয়েকেই তারা সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখেন। তাদের ধারণা, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে ভরণপোষণের দায়িত্বও অন্য পরিবারের ওপর চলে যাবে। এতে নিজেদের আর্থিক চাপ কমবে।

স্থানীয়দের মতে, সামাজিক চাপ বাল্যবিয়েকে আরও জোরালো করে তুলছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, মেয়ের বয়স বাড়লে বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া কঠিন হবে। আবার মেয়েকে বেশি দিন অবিবাহিত রাখলে সমাজে নানা ধরনের কথা শুনতে হবে। ‘মেয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে’, ‘এখনই ভালো পাত্র পাওয়া গেছে’, ‘এখন বিয়ে না দিলে পরে সমস্যা হবে’—এ ধরনের মন্তব্য অনেক পরিবারকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে। কোনো পরিবার মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে না চাইলে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজের পক্ষ থেকেও চাপ তৈরি হয়। একই এলাকার পরিবারগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বেশি হওয়ায় এক পরিবারের বিয়ের পর অন্য পরিবারের ওপরও একই ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে বাল্যবিয়ে ধীরে ধীরে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

প্রশাসনের নজরদারি বা অভিযান চলাকালে কোনো কোনো বিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও সামাজিকভাবে বাল্যবিয়ের প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কিশোরীদের জীবনে। যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই তাদের সংসারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। অনেকেই সংসার সম্পর্কে কোনো ধারণা তৈরি হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। বিয়ের পর দ্রুত গর্ভধারণের কারণে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকিও বাড়ছে। কৈশোর একজন মানুষের মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু এই সময়েই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্বপ্ন দেখা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সুযোগ হারাচ্ছে তারা।

অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক সংসারে দাম্পত্য কলহ তৈরি হচ্ছে। বয়সের ব্যবধান, পারিবারিক মতবিরোধ ও সংসারজীবনের বাস্তবতা অনেক কিশোরীর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বিরোধ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এরপর আবারও দ্রুত তাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অল্প বয়সেই তারা বিয়ে, বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
একই এলাকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অধিকাংশ বিয়ে হওয়ায় পারিবারিক বিরোধ অনেক সময় সামাজিক দ্বন্দ্বে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে কিশোরী মায়েদের শিক্ষা ও দক্ষতার বিকাশ থেমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও।

চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাই বলেন, শিক্ষার সুযোগের অভাবে চরাঞ্চলের অনেক ছেলে-মেয়ে ঝরে পড়ছে। বিশেষ করে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তার দাবি, ইউনিয়ন পরিষদে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিবাহবিচ্ছেদসংক্রান্ত মামলা আসে। গোপনে বিয়ে হওয়ায় অনেক সময় প্রশাসনও তা প্রতিরোধ করতে পারে না।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ভোলা বলেন, আগে এ এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি ছিল। সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এখন তা কিছুটা কমেছে।

দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী বাল্যবিবাহের শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড, এ শাস্তি পিতামাতা বা বরকনে সবার জন্য হতে পারে। এমনকি বিয়ে পরিচালনাকারী কাজীরও একই শাস্তি হতে পারে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ হাসানুল জাহিদের মতে, অনেক পরিবার এখনো জানে না যে ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ইমাম, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতাদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কাজ করা হলেও বাল্যবিয়ে কমানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে জরিমানা করা হলেও সেটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।


আরো খবর