রাজশাহীর চর আষাড়িয়াদহে বাল্যবিয়ে থামছেই না
সরকারি প্রচার-প্রচারণা, আইন প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনের অভিযানের প্রভাব যেন এখনো পৌঁছায়নি রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চলে। গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সেই। এসব বিয়ের বড় অংশের কোনো নিবন্ধন নেই। স্থানীয় ইমাম বা মৌলভীর মাধ্যমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় বিয়ে হলেও অনেক সংসারই অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙেও যাচ্ছে। কিন্তু নিবন্ধন না থাকায় বিয়ে ও বিচ্ছেদের প্রকৃত সংখ্যা কোনো সরকারি দপ্তরের কাছেই নেই।
প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে ১৮ বছর হওয়ার আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াকে অনেক পরিবার স্বাভাবিক এবং নিরাপদ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে। স্থানীয়দের দাবি, এ এলাকায় ১৭ বছর পার হওয়ার পর বিয়ে হয়েছে, এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ বিয়েই হয় ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে।
এই চিত্রের একটি উদাহরণ বাড়িনগর গ্রামের মরিয়ম খাতুনের (ছদ্মনাম) জীবন। কৃষক মোস্তফা কামালের (ছদ্মনাম) মেয়ে মরিয়মের বয়স এখন ১৬ বছর। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৫ বছর বয়সে একই ইউনিয়নের ১৯ বছর বয়সী আসলামের (ছদ্মনাম) সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি। পারিবারিক কলহের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ছয় মাস না পেরোতেই আবারও তার বিয়ে হয় ২২ বছর বয়সী আব্দুল কুদ্দুসের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। এখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যে বয়সে তার পড়াশোনা, খেলাধুলা আর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই বয়সেই তিনি দ্বিতীয় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। পরিবারও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। তাদের কাছে মেয়ের একটি সংসার হয়েছে, সেটিই বড় স্বস্তি।
একই ধরনের গল্প নতুন গ্রামের আয়েশার (ছদ্মনাম)। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার আগেই ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় পাশের গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। সেই সংসার টিকেছিল মাত্র দুই মাস। বনিবনা না হওয়ায় বিচ্ছেদ হয়। এরপর আড়াই মাসের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে অন্যত্র আবারও তার বিয়ে দেওয়া হয়। এখন তার কোলে দুই মাস বয়সী একটি কন্যাশিশু।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বহু কিশোরীর জীবন একই পথে এগোচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অল্প বয়সে বিয়ে, সংসার বোঝার আগেই বিচ্ছেদ এবং পরে আবার বিয়ে হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো এখানে একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বিয়ের অনেক ক্ষেত্রেই শুধু একজন মৌলভীকে ডেকে এনে বিয়ে পড়ানো হয়। অনেক সময় কাজী উপস্থিত থাকেন না। আবার কাজী থাকলেও ১৮ বছরের নিচে বিয়ে নিবন্ধন না করার বিধান মানা হয় না। সূত্র বলছে, কম বয়সে হওয়া বিয়ের তথ্য অনেক সময় আলাদা খাতায় সংরক্ষণ করা হয়। স্বাভাবিক বয়সে হওয়া বিয়ের তথ্য যে খাতায় তোলা হয়, সেখানে এসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে সরকারি নথিতে সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই থাকে না।
কখনো কখনো কোনো বাল্যবিয়ের খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়। তখন বিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধও করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার মৌলভী ডেকে সেই বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নিবন্ধন না থাকার কারণে কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়, তার উদাহরণ ইমন হোসেন (ছদ্মনাম)। তার বয়স এখন ২০ বছর। তিনি বলেন, বিয়ের সময় তার স্ত্রীর বয়স ছিল ১৭ বছর। কাজী বিয়ে পড়ালেও পাঁচ বছর পরও তারা নিবন্ধনের কোনো কাগজ পাননি। পরে প্রয়োজন হলে কাগজ চাইতে গিয়ে বয়স কম থাকার অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক কাজী প্রকাশ্য নিবন্ধনের বদলে আলাদা খাতায় এসব তথ্য সংরক্ষণ করেন। এতে পরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রমাণ করতেও জটিলতা তৈরি হয়।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাই বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে প্রতি শনিবার গ্রাম আদালত বসে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সেখানে বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত কোনো না কোনো মামলা আসে। তার ভাষ্য, বাল্যবিবাহ ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই পরিবারের সম্মতিতে গোপনে অনেক বিয়ে হয়ে যায়। পরে সেসব সংসারের অনেকগুলোই দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদে গড়ায়। তিনি আরও বলেন, বয়স না হলেও কোনো না কোনোভাবে কাজীরা বিয়ে পড়িয়ে দেন। অনেক সময় গ্রামের মাওলানারাও এ কাজে যুক্ত থাকেন।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের কাজী মো. শামসুল হকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন। তবে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরই তিনি কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহের শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড। এ শাস্তি পিতামাতা বা বর-কনে সবার জন্য হতে পারে। এমনকি বিয়ে পরিচালনাকারী কাজীরও একই শাস্তি হতে পারে।
গোদাগাড়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, বাল্যবিয়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। প্রশাসনের নজরে আসে বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যেসব ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়, শুধু সেগুলোর তথ্যই সংরক্ষিত থাকে।
গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ হাসানুল জাহিদ বলেন, হাসপাতালে সন্তান প্রসবের জন্য আসা অনেক মায়ের বয়সই ১৮ বছরের নিচে, যা বাল্যবিয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু অধিকাংশ বিয়ে নিবন্ধিত না হওয়ায় নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, বাল্যবিয়ের খবর পেলেই প্রশাসন তা বন্ধে উদ্যোগ নেয়। তবে অনেক বিয়ে নিবন্ধন ছাড়া সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে অন্তত চার থেকে পাঁচটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।