• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ : আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো ভিইউ সাইফিউশন কৃষকের সার পাচার ও অপচয় ঠেকাতে নজরদারির আহ্বান কৃষিমন্ত্রীর পবায় নিজ উদ্যোগে শতাধিক মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও নগদ অর্থ বিতরণ শিশুর পুষ্টিই জাতির শক্তি,আমাদের করণীয় ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় তানযীমুল উম্মাহর ৬ শিক্ষার্থীর ৯ পুরস্কার জেলা পুলিশের অভিযানে ১৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ২ বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ১৩তম সভা নগরীতে ৩০ লাখ টাকার বেশি বায়না দিয়েও ভূমিদস্যু অপপ্রচারের অভিযোগ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজশাহী মহানগর বিএনপির প্রস্তুতি সভা
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

স্ত্রী-দুই সন্তানকে নিয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত মিনারুল, পৃথক দুই মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সর্বশেষ: শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৫
স্ত্রী-দুই সন্তানকে নিয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত মিনারুল, পৃথক দুই মামলা
স্ত্রী-দুই সন্তানকে নিয়ে চিরনিন্দ্রায় শায়িত মিনারুল, পৃথক দুই মামলা

বাড়ি থেকে হেঁটে দুই মিনিট দূরত্বে পারিবারিক কবরস্থান। পাশাপাশি খনন করা হয়েছিল তিনটি কবর। পশ্চিম দিকের প্রথম দুটি কবর খানিকটা বড়। প্রথমটি বাবা মিনারুলের, পরেরটি ছেলে মাহিনের। সবচেয়ে ছোট কবরটি একেবারে পূর্ব পাশে। এটি ছিল দেড় বছর বয়সী ছোট্ট মিথিলার। কিন্তু মিনারুলের শ্বশুড় বাড়ির লোকজনের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত মিনারুলের স্ত্রী মনিরা বেগমসহ ছোট্ট মিথিলাকে চিরনিন্দ্রায় শায়িত করা হয় মিনারুলের শ্বশুড় বাড়ির কবরস্থানে। এভাবেই দুই বাড়ির চার কবরে স্ত্রী-সন্তানসহ চিরনিন্দ্রায় শায়িত হলেন মিনারুল।

Advertisements

শনিবার বাদ আসর প্রথমে মিনারুল ও ছেলে মাহিনের জানাযা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দুইজনের মরদেহ দাফন করা হয়। পরে মিনারুলের শ্বশুড়বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় মিনারুলের স্ত্রী মনিরা ও মেয়ে ছোট্ট মিথিলাকে।
স্থানীয় পারিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ আলী বলেন, ছেলের পরিবার চারটি মরদেহই নিতে চেয়েছিল। পরে তিনটি মরদেহ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য তিনটি কবরও খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু মরদেহ নিয়ে নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত মিনারুল ও তার ছেলে মাহিনকে তাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিকালে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। আর মিনারুলের স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে শাশুড়ির কাছে দেওয়া হয়। জানাজা শেষে বিকালে তাদেরকে রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মালেক বলেন, দুই পরিবার মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, দুটি করে মরদেহ দুই পরিবার নিয়ে দাফন করবে। ময়নাতদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেভাবেই মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে আলাদা দুটি স্থানে (মিনারুল ও তার ছেলেকে পারিবারিক কবরস্থানে এবং মিনারুলের স্ত্রী ও তার দেড় বছরের কন্যাকে টিকাপাড়া কবরস্থানে) মরদেহগুলো দাফন করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার সকালে পবার সেই বামনশিকড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পাশে কবরস্থানে কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউবা কবর খনন করছেন। এসব কাজ তদারকি করছেন মৃত মিনারুলের চাচা ও চাচাতো ভাইসহ প্রতিবেশীরা।
‘মনের বেদনা’ নিয়ে কবর খোঁড়ার কাজ করছিলেন মিনারুলের প্রতিবেশী মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এক বাড়ির এতগুলো কবর খোঁড়ার কাম আমি আগে কোনোদিন করিনি। কী যে একটা বেদনা। চারডা খোঁড়ার কথা ছিল। কিন্তু মাইয়ার মা বলছে, মাইয়ার লাশ দিবি না। সেই জন্নি তিনটা কবর খোঁড়ার সিদ্ধান্ত হচ্চে।’
মিনারুলের চাচা আবু তালেব বলেন, ‘মেয়ের মরদেহ দেবে না বলে তিনটি কবর খোঁড়া হয়েছে। তাঁরা চেয়েছেন, চারজন একসঙ্গে মারা গেছেন। চারজন এক জায়গায় থাক। কিন্তু তাঁরা এটা মানবেন না। পরে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুইটি করে মরদেহ দুই জায়গায় দাফন করা হলো।
এদিকে বামনশিখর গ্রামের বাড়ি থেকে এই চারজনের লাশ ও চিরকুট উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার (১৫ আগস্ট) রাতে নগরের মতিহার থানায় অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগে মামলা দুটি করা হয়। অপমৃত্যুর মামলাটি দায়ের করেন মৃত মিনারুল ইসলামের বাবা রুস্তম আলী। আর হত্যা মামলা করেছেন মিনারুলের শাশুড়ি শিউলি বেগম।

জানতে চাইলে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মালেক বলেন, ওই ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। একটি অপমৃত্যু ও অপরটি হত্যা মামলা। অপমৃত্যু মামলার বাদী হয়েছেন মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী। আর হত্যা মামলা করেছেন মিনারুলের শাশুড়ি। তবে এসব মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি আবদুল মালেক আরও বলেন, গত শুক্রবার দুপুরে লাশ উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়। পরে শনিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরের আগেই ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

উল্লেখ্য, এর আগে গত শুক্রবার সকালে পবার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামে নিজ ঘর থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত ব্যক্তিরা হলো ওই গ্রামের মিনারুল ইসলাম (৩৫), তাঁর স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮), ছেলে মাহিন (১৩) ও আঠারো মাস বয়সী মেয়ে মিথিলা। মাহিন খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। আর মিনারুল কৃষিকাজ করতেন। ঘটনাস্থল থেকে দুই পৃষ্ঠার একটি চিরকুটও উদ্ধার করা হয়। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।’ পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের ধারণা, অভাব ও ঋণের কারণে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন মিনারুল।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মিনারুলের মেয়ে মিথিলার জন্য গত শুক্রবার সকালে মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী হাট থেকে মাছ কিনে আনেন। দাদি আঞ্জুয়ারা বেগম নাতনিকে ডাকতে যান। অনেক ডাকাডাকির পরও কেউ সাড়া দিচ্ছিলেন না। সকাল পৌনে ৯টার দিকে ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে পাশে ঘরের সিলিংয়ের ওপর দিয়ে ছেলেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে জানাজানি হলে প্রতিবেশীরা বাড়িতে আসেন। স্থানীয় পারিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেদ আলী পুলিশকে ফোন করেন। পরে পুলিশ গিয়ে দুটি কক্ষ থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিনারুল আগে একসময় জুয়া খেলতেন। পরে ছেড়ে দেন। এ জন্য তিনি ঋণগ্রস্ত ছিলেন। দেড় বছর আগে বাবা রুস্তম আলী ধানি জমি বিক্রি করে ঋণের একটা অংশ দেড় লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এরপরও তাঁর তিনটি এনজিওতে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ ছিল। এই ঋণের জন্য প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ২ হাজার ৭০০ টাকার বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু কিস্তি চালাতে পারছিলেন না মিনারুল। বাবাকে মিনারুল আর কিছু জমি বিক্রি করে পুরো টাকা পরিশোধ করতে বলেছিলেন। কিন্তু বাবা চেষ্টা করেও টাকা দিতে পারেনি। এ নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে মিনারুল কথা বলা বন্ধ করে দেন। এমনকি ছেলে–মেয়েদেরও মিশতে দিতেন না।


আরো খবর