গত কয়েকদিন থেকে মরুদ্যানের মত তাপমাত্রা বয়ে যাচ্ছে পদ্মাপাড়ের রাজশাহীতে। রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে বয়ে লু-হাওয়া। তাপমাত্রার পারদ যেন কোনোভাবেই নিচে নামছে না। কেবলই উপরেই উঠছে। এতে প্রচন্ড গরমে মানুষ যেমন কাহিল হচ্ছে তেমনি ফল ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ইতিমধ্যে আম গাছ থেকে আড়ের গুড়ি ঝরতে শুরু করেছে। বোরোর জমিতে সেচ দিতে না পেরে জমি ফেটে চৌটির হয়ে যাচ্ছে।
গেল ১ এপ্রিল মৃদু তাপপ্রবাহ দিয়ে এ অঞ্চলে শুরু হয়েছিল গরমের দাপট। এরপর মাঝারি তাপপ্রবাহ, তারপর শুরু হয়েছে তীব্র তাপপ্রবাহ। আর দুই সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা ৪০-৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশেই অবস্থান করছে। আর শুক্রবার (২৬ এপ্রিল) তাপমাত্রার মারদ উঠেছে আরো উপরে। এদিন বিকেল ৩টায় রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা চলতি মওসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
গত বছরের ১৭ এপ্রিলে রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর চলতি বছরে ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হলো ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ২০০৫ সালের এপ্রিলও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তাই অচল হয়ে পড়েছে রাজশাহীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিরূপ প্রকৃতির কাছে যেন হার মানছে সবকিছুই। থমকে দাঁড়িয়েছে জনজীবন।
এপ্রিল জুড়ে স্মরণকালের তপ্ত মৌসুম পার করছেন রাজশাহীর মানুষ। মৃদু থেকে মাঝারি; মাঝারি থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে এ রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানিয়েছে- বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। চলতি মওসুমে গত বুহস্পতিবার পর্যন্ত এটিই ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। এর আগে শনিবার (২০ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছি ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরদিন রোববারও (২১ এপ্রিল) একই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এরপর ২২ এপ্রিল রেকর্ড হয় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২৩ এপ্রিল রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৪ এপ্রিল ছিল ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে পদ্মাপাড়ের এ মরু শহর।
টানা তীব্র তাপপ্রবাহ যেন রাজশাহীতে স্থায়ী রূপ নিয়েছে । জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল এই রাজশাহীতেই। ওই দিন রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা দেশের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। আর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তাপমাত্রার এই রেকর্ড আর ভাঙেনি।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক মো. গাওসুজ্জামান জানান, ভারি বর্ষণ ছাড়া আপাতত এই তীব্র তাপপ্রবাহ প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর দুই এক দিনের মধ্যে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাতেরও কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই আপাতত বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে টানা তাপপ্রবাহে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ।
এদিকে, খরতাপে ঝরে পড়ছে আম ও লিচুর গুটি। বৃষ্টির জন্য হাহাকার সবখানেই। বিশেষ করে তাপদহে বেকায়দায় পড়েছেন রাজশাহীর বোরো চাষিরা। দিনে দুইতিনবার সেচ দিয়েও ফসল রক্ষা করতে পারছেন না। পানির স্তুর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গভীর নলকুপওে পানি উঠছে না। এতে বোরোর জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।