• ঢাকা, বাংলাদেশ বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান প্রস্তুত, চারস্তরের নিরাপত্তা

রিপোর্টার নাম:
সর্বশেষ: বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

দেশের সর্ববৃহৎ ঈদুল ফিতরের জামাতের জন্য প্রস্তুত কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। ঐতিহ্যবাহী এই মাঠে এবারও ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি হবে ১৯৯তম ঈদ জামাত। জামাত শুরু হবে সকাল ১০টায়। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো হয়েছে সব আয়োজন। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এবারও মুসল্লিদের জন্য থাকবে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা।

বড় জামাতে অংশ নিলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়- এমন বিশ্বাস থেকে মুসল্লিদের ঢল নামে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে। কয়েক লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন একসঙ্গে। জামাতের সময় পুরো এলাকা জমসমুদ্রে পরিণত হয়। ফলে শোলাকিয়ার ঈদ জামাত কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে বাড়তি আনন্দ হিসেবে ধরা দেয়।

ব্যাপক নিরাপত্তার প্রস্তুতি

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তার প্রস্তুতি। ঈদের দিন ঈদগাহে আসার প্রতিটি রাস্তায় থাকবে তল্লাশিচৌকি। মোতায়েন থাকবে বিপুলসংখ্যক র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার। সাদাপোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য উপস্থিত থাকবেন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নজরদারির জন্য মাঠে ইতিমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। এ ছাড়া ঈদের জামাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যামেরাযুক্ত শক্তিশালী চারটি ড্রোন মুসল্লিদের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করবে। তিনটি আর্চওয়ের ভেতর দিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের তল্লাশির মাধ্যমে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করানো হবে। ঈদগাহে মুসল্লিরা শুধু জায়নামাজ ও জরুরি প্রয়োজনে মোবাইলে নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন।

পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে মাঠ, সব কাজ প্রায় সম্পন্ন

ঈদগাহ ময়দানের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরই মধ্যে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে জামাত আদায়ের সুবিধার্থে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে মাঠ। সারির দাগ কাটা হয়েছে। সীমানাপ্রাচীরসহ মাঠের ভেতরের গাছগুলোকে রঙ করা হয়েছে। মিম্বরের চারপাশে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে অস্থায়ী অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে ও আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক। মুসল্লিদের জরুরি প্রয়োজন সারতে রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা। এ ছাড়া মুসল্লিদের স্বাগত জানানোর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কয়েকটি তোরণ।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে মাঠের চার পাশে মাইক বসানো, বিদ্যুতের লাইন টানা, সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ শেষের দিকে। মাঠের শোভাবর্ধনের কাজও গুছিয়ে এনেছেন আয়োজকরা। নারীদের জন্যও আলাদা জামাতের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা গেছে। দুটি জামাতই শুরু হবে সকাল ১০টায়। জামাতে ইমামতি করবেন জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে থাকবেন হয়বতনগর এ. ইউ. কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আবদুল হাই।

নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো হয়েছে সব আয়োজন

ঈদের দিন মাঠে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় মূল মাঠের তিন পাশের রাস্তাঘাট, আশপাশের বাড়িঘরের ছাদ, উঠান ও নরসুন্দা নদীপাড়সহ বিভিন্ন জায়গায় আরও হাজার হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।

মুসল্লিদের জন্য থাকছে দুটি স্পেশাল ট্রেন

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ লাইনে শোলাকিয়া এক্সপ্রেস নামে দুটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে। ময়মনসিংহ ও ভৈরব থেকে দুটি বিশেষ ট্রেন আসবে কিশোরগঞ্জে।

বুধবার ঈদগাহ মাঠের সার্বিক প্রস্তুতি পরিদর্শনে আসেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ মাঠ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, র‍্যাব-১৪ ময়মনসিংহের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান ও পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন।

সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ জামাতের প্রস্তুতি দেখতে বেশ কয়েকবার মাঠ পরিদর্শন করেছি। এবার নিরাপত্তাসহ জামাতের সব প্রস্তুতি সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসন মুসল্লিদের নিরাপত্তা দেওয়াসহ সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমিও এই মাঠে নামাজ আদায় করবো। কিশোরগঞ্জবাসীর শোলাকিয়া মাঠ নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি দাবি রয়েছে, এই মাঠের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বাড়ানো নিয়ে। যা বিগত সময়ে করতে সবাই ব্যর্থ হয়েছে। আমি ইতিমধ্যে এই মাঠের সার্বিক বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে কথা বলেছি, আশা করছি আগামী ঈদুল ফিতরে শোলাকিয়া মাঠে উন্নয়নের সেই সৌন্দর্য ফুটে উঠবে।’

নিরাপত্তার স্বার্থে কেবল জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশের অনুরোধ

নিরাপত্তার স্বার্থে কেবল জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশের অনুরোধ জানিয়েছেন ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা। সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জামাত আয়োজনে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ঈদের জামায়াত আয়োজনের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় নিয়ে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততায় এবার মুসল্লিদের সংখ্যা বিগত দিনের চেয়ে বেশি হবে বলে আমরা আশা করছি। দূরের মুসল্লিদের জন্য থাকবে দুটি ঈদ স্পেশাল ট্রেন।’

চার স্তরের নিরাপত্তা বলয়

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘এখানে কয়েক লাখ মুসল্লি হয়। এবার মুসল্লির সংখ্যা বাড়তে পারে। সে অনুযায়ী নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করতে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার, চারটি ড্রোন ক্যামেরাসহ পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া সাদাপোশাকে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরতে পারবেন বলে আশা করছি।’

তিনি জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জামাত নিশ্চিতে মাঠে থাকবে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয়। ২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার কথা মাথায় রেখে এবারও নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরই মধ্যে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো মাঠ ও আশপাশ। জামাতের সময় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, ১১০০ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার সদস্যের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারি করবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। এবার সেনাবাহিনীও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্ত থাকছে।

যেভাবে শোলাকিয়ার নামকরণ

জনশ্রুতি আছে, মুঘল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি বিবরণে আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে ঈদগাহটি একসময় শোয়ালাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য বইয়েও এ দুটি বর্ণনা আছে। ঈদের দিন সকাল ১০টায় ঐতিহ্য ও রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে পরপর তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এরপর ময়দানে শুরু হবে ঈদুল ফিতরের জামাত।

এরই মধ্যে মাঠের প্রস্তুতি দেখতে আসছেন মুসল্লিরা। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ জামাত আদায় করতে পারবেন। তবে বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও শোলাকিয়া মাঠে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে মাঠের উন্নয়ন ও শোভাবর্ধনের দাবি জানিয়েছেন তারা।


আরো খবর