রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ। শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠ শুধু শিক্ষা বিস্তারের কেন্দ্র নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নীরব ধারক। কলেজের প্রশাসন ভবনের সামনে সাদা–কালো দেয়ালে ফুটে উঠেছে সেই ইতিহাস যা কথা না বলেও অতীতের গল্প শোনায়।
দেয়ালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তজুড়ে হাতে আঁকা ও খোদাই করা চিত্রকর্মে তুলে ধরা হয়েছে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন স্থাপনা, রাজকীয় ইতিহাস ও গ্রামবাংলার জীবনধারা। রাজবাড়ি, মসজিদ, বৌদ্ধবিহার, জাদুঘর, পুরোনো রেলস্টেশন থেকে শুরু করে দরজা জানালার নকশা সব মিলিয়ে এ দেয়াল যেন এক উন্মুক্ত ইতিহাসের গ্যালারি।
ইট পাথরের গায়ে খোদাই করা এসব চিত্র সময়ের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের কাছে এটি শুধু নান্দনিক সৌন্দর্য নয়, বরং অতীতের সমাজব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিচ্ছবি। দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অনেকের চোখ আটকে যায় ইতিহাসের পাতায়। কেউ থেমে যায়, কেউ ক্যামেরাবন্দি করে রাখে স্মৃতি, আবার কেউ নিজের ফটোসেশনেও ইতিহাসকে সঙ্গী করে নেয়।
দেয়ালে ধারাবাহিকভাবে আঁকা হয়েছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার (সোমপুর বিহার), হযরত শাহমখদুম (র.) এর মাজার শরিফ, রাজশাহী কলেজের প্রশাসন ভবন, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম, সোনা মসজিদ, কুসুম্বা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি, নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি, বালিহার ও ধবলহাটি রাজবাড়ি, বাঘা মসজিদ, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনসহ এই জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা দৃশ্য।
ডিগ্রি বিভাগের শিক্ষার্থী তাসলিমা খাতুন বলেন, িএই ধরনের চিত্রকর্ম অতীতকে বাঁচিয়ে রাখার একটি আধুনিক পদ্ধতি। নতুন প্রজন্ম বইয়ের পাতায় নয়, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসা স্থাপনা ও জনপদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. শিখা সরকার বলেন, রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে ব্রিটিশ উপনিবেশিক সময়ে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের পরই এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষ এই কলেজে শিক্ষালাভ করেছেন।
ড. শিখা সরকার জানান, কলেজের প্রশাসন ভবনের সামনের দেয়ালচিত্র সবই ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ। দেয়ালচিত্রে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার থেকে শুরু করে শাহমখদুম (র.) এর মাজার, বরেন্দ্র মিউজিয়াম, পুঠিয়া ও নাটোর রাজবাড়ির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠায় যেসব রাজা–জমিদারের অবদান রয়েছে।
এছাড়াও দেয়ালে স্থান পেয়েছে সাঁওতাল নৃত্য, মাছ ধরা, ঢেঁকিতে ধান ভাঙার মতো গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য যা বরেন্দ্র অঞ্চলের লোকজ জীবনধারাকে জীবন্ত করে তুলেছে। ড. শিখা সরকার বলেন, এই দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা এক নজরেই পুরো অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে পারে। এটি শুধু একটি দেয়াল নয় এটি আমাদের স্মৃতি, সংগ্রাম ও গৌরবের নীরব দলিল।