• ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

টেকসই সহযোগিতায় ঐকমত্য

রাজশাহী সংবাদ ডেস্ক
সর্বশেষ: রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪

Advertisements

দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিশন নিয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। গতকাল শনিবার নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুদেশের স্বার্থে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল এবং সবুজ অংশীদারত্বের জন্য যৌথ দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্মত হয়েছেন।

একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা জানান দুই প্রধানমন্ত্রী।

বিবৃতিতে শেখ হাসিনা তার সফরকে ফলপ্রসূ অভিহিত করে বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, রাজনীতি ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও সংযোগ, জ্বালানি ও শক্তি এবং আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছি। উভয় দেশই একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে পথ দেখানোর জন্য ‘রূপকল্প ঘোষণা’ অনুমোদন করেছে। আমরা টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ‘ডিজিটাল অংশীদারত্ব’ এবং ‘সবুজ অংশীদারত্ব’-বিষয়ক দুটি সমন্বিত রূপকল্প সামনে রেখে কাজ করতে দুপক্ষই সম্মত হয়েছি।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, উভয় দেশ একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ও সবুজ অংশীদারত্বের জন্য যৌথ দৃষ্টিভঙ্গিতে রাজি হয়েছে।

ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং আঞ্চলিক অংশীদার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সৃষ্ট সম্পর্ককে বাংলাদেশ সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব দেয়।’ ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্রমাগত বিকশিত এবং দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে’ বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দুই দেশের এবং জনগণের কল্যাণের জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে সম্মত হয়েছি। আমাকে ও আমার প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ আতিথেয়তা প্রদান করার জন্য আমি ভারত সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে তার শেষ দ্বিপক্ষীয় সফর করেছিলেন এবং ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র আমন্ত্রিত অতিথি দেশ বাংলাদেশের নেতা হিসেবে নয়াদিল্লিতে ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন আমি এই জুন মাসে অভূতপূর্ব দ্বিতীয়বারের মতো নয়াদিল্লি সফর করছি।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৯ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আরও কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে নয়াদিল্লি সফর করেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসবই আমাদের এ দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করার প্রমাণ বহন করে।’ শেখ হাসিনা তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান এবং তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘নতুন নতুন ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য দুই দেশ আজ ভবিষ্যৎ ভিশন তৈরি করেছে’ উল্লেখ করে বলেন, ‘ডিজিটাল ও গ্রিন পার্টনারশিপ, ব্লু ইকোনমি, স্পেসসহ অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতা দুই দেশের জন্য লাভজনক হবে।’

তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য দ্রুত একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে যাবে।’ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর কথা উল্লেখ করেন মোদি। তিনি বলেন, বন্যা ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কসংকেত, সুপেয় পানি প্রকল্পে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে।

মোদি আরও বলেন, ‘৩০ বছর মেয়াদি ১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন করার জন্য কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছি। দুই দেশের ফোকাস হচ্ছে কানেকটিভিটি, কমার্স এবং অন্যান্য সহযোগিতা। গত ১০ বছরের মধ্যে আমরা ১৯৬৫-এর আগে যে কানেকটিভিটি ছিল, সেটি পুনঃস্থাপন করেছি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এখন আমরা ডিজিটাল ও জ্বালানি কানেকটিভিটির ওপর জোর দেব। এর মাধ্যমে দুই দেশের আর্থিক ব্যবস্থা গতিশীল হবে।’ তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও বাড়ানোর জন্য দুপক্ষ সেপা (কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট) নিয়ে আলোচনা করব।’ তিনি ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের ই-মেডিকেল ভিসা দ্রুত চালু করার ঘোষণাও দেন।

মোদি বলেন, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে রংপুরে ভারতের একটি নতুন সহকারী হাইকমিশন খোলা হবে। তিনি বলেন, ‘আমি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপে আজকের (গতকাল) ম্যাচের জন্য ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দলকেই শুভকামনা জানাই।’

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে ভারত আগ্রহী জানিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর জন্য প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন থেকে শুরু করে আধুনিকীকরণের জন্য আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও শান্তিপূর্ণ সীমান্তের জন্য সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ভারত মহাসাগরের ক্ষেত্রে দুই দেশের ভিশন এক রকম। ইন্দো-প্যাসিফিক ওশান উদ্যোগে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে ভারত স্বাগত জানায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা চলমান আছে। কিন্তু গত এক বছরে অনেক কিছু হয়েছে। তিনি জানান, আখাউড়া-আগরতলা ব্রিজ, দুই দেশের মধ্যে রেল লিংক প্রকল্প, মোংলা বন্দর দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর জন্য কার্গো সুবিধা, মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেলসংযোগ, ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের উৎপাদন শুরু, টাকা-রুপি বাণিজ্য, গঙ্গা নদী দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের লম্বা রিভার ক্রুজ, বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন, ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য সবকিছু এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা দুই দেশের সম্পর্কের মাত্রা কত গভীর, সেটি প্রমাণ করে।

শেখ হাসিনার এবারের সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ভারতের নেইবারহুড পলিসি, অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি, ভিশন সাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনের মাঝখানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরগুলোয় আমরা অন্তত ১০ বার দেখা করেছি। কিন্তু এবারের সাক্ষাৎটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম রাষ্ট্রীয় অতিথি।’

শেখ হাসিনার এ সফর সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক বন্ধন আরও গভীর করার লক্ষ্যে আলোচনা করেছেন। তারা আলোচনায় উন্নয়ন, অংশীদারত্ব, জ্বালানি, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তর কথা বলেছেন।

গত শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুদিনের সরকারি সফরে দিল্লি যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করার পর ভারতে কোনো সরকারপ্রধানের এটিই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। এ ছাড়া শেখ হাসিনার এ সফরটি ১৫ দিনেরও কম সময়ে দেশটিতে তার দ্বিতীয় সফর।

ব্রিকসের সদস্য হতে দিল্লির সমর্থন চেয়েছে ঢাকা : বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য ভারতের সমর্থন চেয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

উদীয়মান-বাজারের দেশগুলোর জোট ব্রিকসের (বিআরআইসিএস) সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে জোটের নাম বিআরআইসিএস।

গতকাল বিকেলে নয়াদিল্লির হোটেল তাজ প্যালেসে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি ব্রিকস নতুন সদস্য বা অংশীদার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা ব্রিকসের অংশ হতে চাই। এই লক্ষ্যে ভারতের কাছে সমর্থন চেয়েছি (প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনার সময়)।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও কর্মকর্তাদেরসহ দলগতভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় সব বিষয় আলোচনা হয়। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান।’

দুই দেশের মধ্যে সংযোগ বা কানেকটিভিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর যাতে ভারতের উত্তর-পূর্ব বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের জন্য ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে তাদের আগ্রহ ও আমাদের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে রাজনৈতিকভাবে দুই দেশের ঐকমত্যের অভাব নেই জানিয়ে হাছান মাহমুদ বলেন, এরপরও যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোও যাতে একদম কমানো যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এগুলোর নাব্য রক্ষাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বন্যা-দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়েও গুরুত্বসহকারে আলোচনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার প্রসার, ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানিতে সহায়তা এবং ভারত যে ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন সঞ্চালন লাইন করছে সেটি থেকে কীভাবে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।

এ সময় পেঁয়াজ, তেল, গম, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিতে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষণ ও আমদানি যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা করেছি, বলেন হাছান মাহমুদ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনায় চীনের ভূমিকা বৃদ্ধির কথাও এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে এটি আলোচনা করবেন বলেছেন। ভিসা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি জানান, বাংলাদেশিদের জন্য ভারত বছরে প্রায় ২০ লাখ ভিসা প্রদান করে, মেডিকেল ভিসা ত্বরান্বিত করতে ও অন্যান্য ভিসার অযথা বিলম্ব^রোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাদের মিশনগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন।

ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

১০ এমওইউ সই : প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে আরও সুসংহত করতে সাতটি নতুন ও তিনটি নবায়নকৃতসহ ১০টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

৭ নতুন এমওইউ হলো বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ, বাংলাদেশ-ভারত গ্রিন পার্টনারশিপ, সমুদ্র সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, ভারতের ইন-স্পেস এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, বাংলাদেশ ও ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংযোগ-সংক্রান্ত, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ভারতের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউটের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতায় ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ, ওয়েলিংটন-ইন্ডিয়া এবং মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের মধ্যে সমঝোতা।

তিনটি নবায়নকৃত এমওইউ হলো স্বাস্থ্য ও ওষুধ-সংক্রান্ত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনে ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি এবং বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা এবং মৎস্যম্পদের উন্নয়ন সংক্রান্ত।

রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছেন। গতকাল রাষ্ট্রপতি ভবনে একটি লালগালিচা বিছিয়ে শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানান নরেন্দ্র মোদি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৯টার দিকে (স্থানীয় সময়) রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছান। পরে রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের একটি অশ্বারোহী দল ভবনের গেট থেকে তার গাড়িবহরকে বেস্টন করে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত নিয়ে যায়। ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী গার্ড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন।

এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রেজেন্টেশন লাইনে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও তার সফরসঙ্গীদের মোদির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ, রেলওয়ে সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবির, ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান, স্পিচ রাইটার মো. নজরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহসহ তার সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তিনি গতকাল রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। শেখ হাসিনা ভারতের মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তিনি সমাধিতে ফুলের পাপড়িও ছড়িয়ে দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেখানে পরিদর্শন বইয়েও স্বাক্ষর করেন। এর আগে তার আগমনে রাজঘাট সমিতির প্রধান তাকে স্বাগত জানান।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা ভারতের রাষ্ট্রপতির : ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছে।

ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা গতকাল রাষ্ট্রপতি ভবনে দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এবং নতুন নতুন খাতে প্রবেশ করছে। এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।

শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েক দিন পর তার সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায় তিনি আনন্দিত।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ কথোপকথনে দুই নেতা অর্থনৈতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন অংশীদারত্ব, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সংযোগসহ সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হন।

প্রধানমন্ত্রীকে মধ্যাহ্নভোজে কলকাতার বিরিয়ানি পরিবেশন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হায়দরাবাদ হাউজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আয়োজিত এক ব্যাংকুইট মধ্যাহ্নভোজে কলকাতার বিরিয়ানি, সুগন্ধি বাসমতী চালের ভাত এবং কলকাতার স্টাইলে রান্না করা ও স্বাদযুক্ত শাকসবজি এবং অন্যান্য স্থানীয় খাবার পরিবেশন করা হয়েছে।

ভোজ শুরু হয় ভারতের স্ট্রিট ফুড হিসেবে বহুল পরিচিত দই-ফুচকা দিয়ে। এরপর আসে স্টু বা সুরুয়া। পার্ল মিলেট (মুক্তা বাজরা) আর মটরশুটি দিয়ে তৈরি ওই স্টুর নাম ‘মটর অর বাজরে কা শোর্বা’।

মাছের পাতুরি বাঙালির অতি প্রিয় পদ। তবে নিরামিশাষী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনার জন্য পরিবেশন করেন ছানার পাতুরি। ওই পাতুরিতে ছানার সঙ্গে মেশানো ছিল নারকেল, কাঁচা আম, মরিচ আর সরিষা বাটা। এরপর পরিবেশন করা হয় শিঙাড়া। শিঙাড়ার পুর হিসেবে ছিল আলু, ফেটা চিজ, ফুলকপি, বাদাম ও থাইম।

শেখ হাসিনাসহ অতিথিদের পাতে এরপর দেওয়া হয় ‘আমারান্থ কোফতা গুলবদন’ অর্থাৎ কোফতার কারিতে সেদ্ধ করা আমারান্থ বাজরার ডাম্পলিং। তারপর পাতে আসে গুজরাতি পদ ‘পঞ্চমেল নি সবজি’; অর্থাৎ, জিরা, পেঁয়াজ আর টমেটো দিয়ে রান্না পাঁচমিশালি সবজি। এরপর পাতে দেওয়া হয়, দইপনির। এই পদটি বিভিন্ন মসলায় মাখানো পনিরের স্টেক, যা টকদই এবং নানা ভারতীয় মসলায় রান্না করা। আরও ছিল শুক্তো ও মসুর ডাল।

এ ছাড়া ছিল স্পেশাল ভারতীয় রুটি, পান রসমালাই কুলি, গুড়ের জিলাপি ও আমের কুলফি এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফলমূল ও মাসালা কফি।

শেখ হাসিনার সফর ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের গভীরতারই প্রতিফলন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের প্রতিফলন বলে অভিহিত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। তিনি গতকাল তার অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজকের রাষ্ট্রীয় সফর ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর (বন্ধুত্ব) গভীরতা প্রতিফলিত করে। ভারতের নতুন মেয়াদে প্রথম রাষ্ট্রীয় অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কতটা গুরুত্ব দেন তা দেখিয়েছেন।

জয়শঙ্কর বলেন, ‘সত্যিকারের ভালো প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলগুলোকে সুসংহত এবং নতুন ভিত্তি তৈরি করছে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথমে’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’, সাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির সংযোগস্থলে রয়েছে বাংলাদেশ।

দিল্লি সফর শেষে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী : ভারতে দুদিনের সরকারি সফর শেষে গতকাল রাতে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনি ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ৬টা ২০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময়) নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দর ত্যাগ করে এবং ফ্লাইটটি রাত ৮টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. মুস্তাফিজুর রহমান বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।


আরো খবর