• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

হারিয়ে যাচ্ছে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প

চারঘাট প্রতিনিধি
সর্বশেষ: বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫
হারিয়ে যাচ্ছে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প
হারিয়ে যাচ্ছে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প

Advertisements

চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প আজ ধংসের দারপ্রান্তে এসে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশের খয়ের উৎপাদনের একমাত্র প্রসিদ্ধস্থান ছিল, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রয়োজনীয় উপকরণ, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থার কারণে ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প আজ হুমকির মুখে। চারঘাটের উৎপাদিত খয়ের দিয়ে এক সময় প্রায় সারা দেশের মানুষের পান খাওয়া চলত। চারঘাটের খয়েরের গুনগত মান ও স্বাদ সারাদেশে বেশ পরিচিত ছিল। শুধু তাই নয়, এই খয়ের থেকে তৈরি হতো খয়েরী রঙ। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালের দিকে চারঘাটে খয়ের উৎপাদন যাত্রা শুরু হয়।

তারা আরো জানায়, ভারতীয় উপমহাদেশে এই খয়ের শিল্পের উৎপত্তিস্থল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) চারঘাট থেকে খয়ের উৎপাদন শুরু হলে এখান থেকে লাহোর করাচীসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে খয়ের রপ্তানি করা হতো। আর তখন এর কদরও ছিল অনেক। একসময় খয়ের শিল্প ছিল চারঘাট উপজেলার হাজারও মানুষের জীবিকার উৎস্য। স্থানীয়ভাবে উপজেলার কয়েকটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই ছিলো খয়ের কারখানা। এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণরুপে বদলে গেছে। কয়েক দশক আগে যেখানে প্রায় শতাধিক কারখানা চালু ছিলো বর্তমানে তা এসে দাড়িয়েছে হাতে গোনা ১০-১২ টায়। খয়ের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তুলনায় খয়ের গাছ বর্তমানে তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্ত চারঘাটের এই ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য তৎকালীন উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ড. নুর ইসলাম ইউসুফপুর পদ্মার চরে প্রায় ২০ হাজার খয়ের গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর সরকারিভাবে খয়ের গাছ লাগানোর উদ্যোগ কেউ আর নেয়নি।

খয়ের তৈরির প্রক্রিয়া: প্রথমে খয়ের গাছের উপরের চামড়া (ছাল) তুলে ফেলা হয়। তারপর গাছটি কুচিকুচি করে কেটে মাটির পাতিলে করে বিশেষ চুল্লিতে আগুনে জ্বাল (ফুটিয়ে) করে রস গাঢ় করতে হয়। বড় মাটির পাতিলে ঢেলে রাখলে তা জমে যায়। যাকে বলা হয়, লালী খয়ের বা কাঁচা খয়ের। এই লালী খয়ের একমাত্র চারঘাটের হাটে কেনাবেচা হয়ে থাকে। যা বাংলাদেশের আর কোথাও কেনাবেচা হয় না। স্থানীয় খয়ের ব্যবসায়ীরা এই লালী খয়ের ক্রয় করে পুনরায় আগুনে জ্বাল করে ঘন করে তারপর একটু ঠান্ডা হলে মেশিনের সাহায্যে চাপ দিলে বাহির হয়, চার কোণা আকৃতির খয়ের। দানা ও গুটি কেটে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঠান্ডা স্থানে শুকাতে হয়। কারণ রোদে শুকালে খয়েরের দানা ও রঙ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। অনেক সময় খয়েরের গুটি শুকাতে ২ থেকে ৩ মাস লেগে যায়। পানের ভেতরে দেওয়া গুটি খয়ের প্রক্রিয়াকরণ শুধুমাত্র চারঘাট এলাকায় হয়ে থাকে।

বর্তমানে চারঘাটে ভালোমানের কাঁচা লালী খয়ের ৩৬ থেকে ৩৮ হাজার টাকা আর শুকনা গুটি খয়ের ১৫শ টাকা হতে ১৬শ টাকা কেজি দরে ঢাকা, দিনাজপুর, নীলফারমারী, ঠাকুরগাঁও, খুলনা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর, জামালপুর, শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রয় করে থাকেন। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান,আড়তদারদের নিকট হতে খয়েরের টাকা সঠিক সময়মত পরিশোধ না পাওয়ায় ব্যবসায় ভাটা পড়ে যায়। যার কারণে খয়ের ব্যবসায়ীদের তিনগুণ পুুঁজির প্রয়োজন হয়।
চারঘাটের খয়ের ব্যবসায়ী এনামুল দুঃখ করে বলেন, আমার বাবার আমল থেকে প্রায় ৪০/৫০ বছর ধরে আমরা এই খয়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আগের মতো এখন আর খয়ের ব্যবসায় তেমন একটা লাভ নেই। বর্তমানে খয়ের ব্যবসায় চরম মন্দাভাব চলছে। এই ব্যবসায় অনেক সময় ব্যাবসায়িক কারণে বিভিন্ন মোকামে টাকা পড়ে থাকে। এ কারণে খয়ের ব্যবসায় তিনগুণ পুুঁজির প্রয়োজন হয়। যার জন্য স্থানীয় খয়ের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে আছে। বর্তমানে চারঘাটে খয়ের গাছের অভাব দেখা দেওয়ায় আমরা লালী খয়ের নাটোর জেলার আব্দুলপুর, গোপালপুর, লোকমানপুর হতে কিনে গুটি খয়ের তৈরি করে থাকি। আর কিছু লালী খয়ের আমাদের নিজ এলাকায় উৎপাদন হয়ে থাকে।

চারঘাটের খয়ের ব্যবসায়ী আশরাফ বলেন, আমার বাবার আমল হতে খয়ের ব্যাবসা করে আসছি। আমার ব্যবসায় ক্ষতি হলেও বাবার রেখে যাওয়া ব্যাবসার ঐতিহ্য ধরে রেখেছি । চারঘাটে লালী এবং গুটি খয়ের তৈরি করা ব্যবসায়ীর ১০-১২ জন এখনও এই পেশার সঙ্গে জড়িত আছেন। আগে বিভিন্ন এলাকায় খয়ের গাছ জন্ম নিতো কিন্তু এখন এই খয়ের গাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে সপ্তাহে ২ দিন শনিবার ও বুধবার চারঘাটের হাটে এই খয়ের গাছ কেনা বেচা হয়ে থাকে। খয়ের ব্যবসায় যেমন এখন আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে, তেমনি এখন খয়ের গাছ না পাওয়ায় গাছও কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামে।

খয়ের কারখানার কারিগর ঝিকরা গ্রামের সাইফুল বলেন, আমাদের কয়েক প্রজন্ম এই পেশায় ছিলেন। আমিও প্রায় ৪০ বছর হলো খয়ের তৈরি করছি। এই শিল্পে আয় একেবারেই সীমিত। নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসতে চাই না। কারখানা মালিক তাসফিয়া বলেন, দেশের ভেতর একমাত্র চারঘাটের খয়েরগুলি ভেজাল ছাড়া উৎপাদন হয়ে থাকে। বাকি দেশের বিভিন্নস্থানে যে খয়ের পাওয়া যায় সেগুলি কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করা খয়ের। একসময় এই খয়ের বিক্রয় করে অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি স্বাবলম্বী হয়েছি। তবে এখন অনেক সময় উৎপাদন খরচ উঠেনা। সরকারি সাহায্য ছাড়া এ শিল্প টিকবে না। চারঘাটের খয়ের ব্যবসায়ীরা জানান, ঐতিহ্যবাহী এই খয়ের শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণসহ প্রতিবছর ব্যাপকহারে খয়ের গাছের চারা রোপণ করা। এ বিষয়ে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আব্দুল মুকিম বলেন,খয়ের উৎপাদনকারী কারখানা সমিতি নামে সমবায় রেজিস্ট্রেশন রয়েছে তবে বর্তমানে তা অকার্যকর। উপজেলার সমবায়ের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তার কোন সুযোগ নেই তবে এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হবে বলে জানান তিনি।


আরো খবর