নীরব লড়াইয়ের এক মানবিক গল্প। রাজশাহীর জাদুঘর মোড়ে শহরের ব্যস্ততা, যানবাহনের শব্দ আর মানুষের ভিড়ের মাঝেই যেন অদৃশ্য হয়ে থাকা এক মানুষ। রাস্তার পাশের ছোট্ট একটি চায়ের দোকানে বসে আছেন চোখে মোটা চশমা, মুখে ক্লান্তির ছাপ, শরীরজুড়ে বয়স আর অসুস্থতার ভার। নাম তার মোঃ রাজু। বয়স ৫৩। একসময় যিনি ছিলেন কর্মঠ, ছুটে বেড়ানো মানুষ, আজ তিনি সাতবার ব্রেন স্ট্রোকের পরও জীবনের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন নিঃশব্দে।
রাজু আর আগের মতো নন, কথা বলতে গেলে ধীরতা আসে, শরীর সবসময় সাড়া দেয় না। তবুও প্রতিদিন বিকেল হলেই নিজের ছোট্ট দোকানে এসে বসেন। কারণ থেমে গেলে যে থেমে যাবে জীবনটাই।
রাজু রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী ইউনিয়নের মৃত জাফরের ছেলে। প্রায় ৩৪ বছর ধরে রাজশাহী শহরেই তার বসবাস। এখন থাকেন ভাড়া বাড়িতে, জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে গার্মেন্টসে কাজ করে। টানা ২৪ বছর এক প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছেন। মাস শেষে সামান্য বেতনই ছিল তাঁর পরিবারের ভরসা। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় একদিন হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করে। এরপর একের পর এক মোট সাতবার। আর সেখানেই থেমে যায় রাজুর চাকরির জীবন।
চোখের চশমা নামিয়ে ধীরে ধীরে রাজু বলেন, চাকরির জায়গা থেকে আমাকে বের করে দিয়েছে। এত বছর কাজ করলাম, কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর কেউ আমাকে রাখার কথাও ভাবল না। চাইলে তো হালকা কাজ দিতে পারত। কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে। বাকিটুকু আর বলেন না।
চাকরি হারানোর পর প্রায় ছয়-সাত মাস ঘরেই বসে ছিলেন রাজু। শরীর সায় দিচ্ছিল না, মনও ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সংসার তো আর অপেক্ষা করে না। এক ছেলে ও এক মেয়ে তারা এখন নিজেদের সংসারে, রাজু ও তাঁর স্ত্রী একসাথেই থাকেন। অসুস্থ শরীর নিয়েই সংসারের দায় কাঁধে নিতে হয় তাকেই। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে জাদুঘর মোড়ে খুলে বসেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। দোকানে রেডিমেড চা, কলা, বিস্কুট, সিগারেট আর পাউরুটি এই নিয়েই রাজুর জীবনযুদ্ধ।
প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মতো বিক্রি হলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাভ থাকে। অনেক দিন সেটাও হয় না। তবুও প্রতিদিন বিকেলে চেয়ার টেনে বসেন রাজু। দোকান খুলে বসে থাকেন হয়তো কারও আসার অপেক্ষায়, হয়তো নিজের ভেতরের শক্তিটুকু হারাতে না দেওয়ার জন্য। মাঝেমধ্যে পাশে এসে দাঁড়ান তাঁর সহধর্মিণী আফরোজা। চুপচাপ দোকানের কাজকর্ম দেখেন। তিনিই রাজুর একমাত্র ভরসা।
রাজু বলেন, প্রতি মাসে চিকিৎসার পেছনে অন্তত ২৬০০ টাকা খরচ হয়, ওষুধ না খেলে শরীর চলে না। অনেক কষ্ট হয়। তবু দোকানটা চালিয়ে নিচ্ছি। বয়স আর অসুস্থতা থাকলেও পরিবারের কথা ভেবেই বসে থাকি না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তাঁর চোখে জল জমে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, আমি কষ্টের কথা কাউকে বলতে চাই না। কেউ শুনলেও হাসবে, মজা নেবে, তাই চুপ থাকি। এই চুপ করে থাকা রাজুর জীবনের সবচেয়ে বড় আর্তনাদ।
রাজুর জীবনে নেই কোনো আলোঝলমলে গল্প। নেই বড় কোনো সাফল্য, নেই ভাইরাল হওয়ার মতো ঘটনা। আছে শুধু নীরব লড়াই। সহধর্মিণীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা। আজ পর্যন্ত কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি এগিয়ে আসেনি তাঁর পাশে। নেই সরকারি অনুদান, নেই কোনো প্রভাবশালীর সহানুভূতি। তবুও রাজু বললেন না আমি ভেঙে পড়েছি। তিনি শুধু বলেন, আমি ভাঙিনি শুধু একটু ক্লান্ত। এই ক্লান্ত পথের একমাত্র সঙ্গী তাঁর স্ত্রী আফরোজা। দিনের শেষে তিনিই এসে দাঁড়ান দোকানের পাশে। চায়ের কাপ এগিয়ে দেন। দু’টি কথা বলেন। সেই মুহূর্তে রাজুর চোখে জল আসে। সে জল কান্না নয় হয়তো কৃতজ্ঞতা, হয়তো ভালোবাসা, হয়তো বেঁচে থাকার আরেক দিনের সাহস।
একপর্যায়ে রাজু হঠাৎ এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলতে হয়। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে, কিন্তু চোখের গভীর অন্ধকার নিয়ে তিনি বললেন, জীবনে তো সারাজীবন বেঁচে থাকবো না। আমার সহধর্মিনী আর আমার মৃত্যু যদি একসাথেই হয়, আর কবরটা যেন পাশাপাশি হয়। এই কথার ভেতর কোনো নাটকীয়তা নেই। নেই মৃত্যুভয় নিয়ে হাহাকার। আছে নিঃসঙ্গ এক মানুষের নিঃশব্দ উপলব্ধি। রাজু হয়তো বুঝে গেছেন তিনি চলে গেলে, তাঁর সহধর্মিনী আফরোজাকে দেখার মতো, আগলে রাখার মতো এই পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না। যে মানুষটি দিনের পর দিন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়, অসুস্থ শরীরের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয় তাঁর জন্য ভবিষ্যতে কোনো আশ্রয় নেই।
এই উপলব্ধি থেকেই হয়তো মৃত্যুর কথাও তিনি একা ভাবেন না। ভাবেন দু’জনকে একসাথে। জীবনের মতো মৃত্যুতেও যেন আলাদা হতে না হয়। যেন একজন চলে গেলে অন্যজনকে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা পড়ে থাকতে না হয়। রাজশাহীর এই ব্যস্ত মোড়ে বসে থাকা রাজু আমাদের সমাজেরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যারা হার মানেন না, কিন্তু যাদের কষ্ট কেউ দেখে না।