ই-কমার্সে ভেজাল খাদ্যপণ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরেজমিনে পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর অংশ হিসেবে রাজশাহীর পবা উপজেলার বজরাপুর গ্রামে খেজুরের গুড় উৎপাদন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছে সংস্থাটি। শনিবার ভোরে ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সরবরাহকারী গাছিদের উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন।
ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে শুরু হয়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী এই পরিদর্শনে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ, চুলায় জ্বাল দেওয়া, গুড় ঘন করা ও সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরেজমিনে দেখা হয়। কোনো পর্যায়ে চিনি, কেমিক্যাল বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।
পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ই-কমার্সে ভেজাল গুড় নিয়ে আমরা নিয়মিত অভিযোগ পাই। তবে ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজের সরবরাহকারীদের উৎপাদন প্রক্রিয়া আমরা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছি। ভোর সাড়ে ৬টা থেকে শুরু করে দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেখেছি। এখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। তাঁরা খাঁটি গুড়ই উৎপাদন করেন। সততা ও স্বচ্ছতার কারণেই মুরাদ পারভেজ আজ সফল।
পরিদর্শনে দেখা যায়, পবা উপজেলার বজরাপুর ও কাঠালবাড়ি এবং দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছি গ্রামের গাছিরা ম্যাংগো লাভারের নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছেন। কোথাও চিনি বা কোনো রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে না। শুধু জ্বাল দিয়ে প্রাকৃতিক উপায়েই গুড় প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞানে স্নাতক এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ২০২০ সালে তিনি ‘ম্যাংগো লাভার’ নামে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। শুরুতে আম বিক্রির মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও পরে লিচু ও রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড় যুক্ত হয় তাঁর পণ্যের তালিকায়।
বর্তমানে ম্যাংগো লাভার প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩০০ গ্রাহকের কাছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কেজি গুড় সরবরাহ করা হচ্ছে। এই সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছেন ১০৬ জন গাছি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৫ জনের। প্রায় ৬ হাজার খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে আরও ৮০ জনের বেশি মানুষ নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে একসময় অবহেলায় কেটে ফেলা খেজুরগাছ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে।
ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে পাটালি ও লালি গুড় কেজিপ্রতি ৩৯০ টাকা এবং বীজ (চকলেট) ও গুড় ৪৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ভেজালমুক্ত ও খাঁটি পণ্যের নিশ্চয়তার কারণে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
পুষ্টিবিদ ও উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ বলেন, আমি খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছি। পড়াশোনার সময় থেকেই উপলব্ধি করেছি—মানুষ কী খাচ্ছে, সেটার সঙ্গে তার স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সরাসরি জড়িত। তাই শুরু থেকেই আমার নীতি একটাই মানুষকে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার খাওয়াব।
আবেগঘন কণ্ঠে উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ বলেন,আজ ভোক্তা অধিদপ্তর এসে সরেজমিনে পুরো প্রক্রিয়া দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এটা আমার জন্য বড় প্রাপ্তি। এতে প্রমাণ হয়, আমরা শুধু কথায় নয়, কাজেও ভেজালমুক্ত খাবারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি। আমার উদ্যোগ শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি কাজ করে যাচ্ছি। ফলে আজ ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। আমি চাই, ই-কমার্স মানেই যেন ভেজাল ঝএই ধারণা বদলে যাক। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোক্তা অধিদপ্তরের এই সরেজমিনে পরিদর্শন ই-কমার্সে আস্থা তৈরির একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।