মানুষ তার ভাব, চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের জন্য যে অর্থপূর্ণ ও বোধগম্য ধ্বনি উচ্চারণ করে, তাকে ভাষা বলা হয়। ভাষা মানুষে মানুষে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। কণ্ঠধ্বনির মাধ্যমে মানুষ সূক্ষ্মতম অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারে, যা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে ভাষা প্রকাশের দুটি রূপ বিকশিত হয়েছে—কথ্য ও লিখিত। ধ্বনির লিখিত রূপই হলো বর্ণ বা অক্ষর।
আধুনিক বাংলা ভাষায় প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি শব্দ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৭% তৎসম (সংস্কৃতজাত), ২৮% তদ্ভব (গৌড়ীয় প্রাকৃতজাত) এবং অবশিষ্ট ৫% বিদেশি উৎস থেকে আগত। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সাত হাজার সক্রিয় ভাষা রয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। এর অর্ধেকেরও বেশি ভাষার নিজস্ব লিপি নেই। অবশিষ্ট ভাষাগুলোর জন্য প্রায় ৩০০টির মতো স্বতন্ত্র লিখনপদ্ধতি রয়েছে। বাংলা ভাষা তাদের অন্যতম।
জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা। তবে এই ভাষা একদিনে গড়ে ওঠেনি; হাজার বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। আমরা আজ যে ভাষায় কথা বলি, তা এক হাজার বছর আগে এমন ছিল না, ভবিষ্যতেও একই থাকবে না। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ এই বিবর্তনের উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
গৌড়ীয় উৎস ও প্রাকৃত ধারা
বাংলা ভাষার শিকড় খুঁজতে গেলে বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী প্রাচীন গৌড় অঞ্চলের কথা উল্লেখ করতে হয়। প্রাচীন বাংলার ভাষাকে বলা হতো গৌড়ীয় ভাষা, যা ছিল মধ্য ইন্দো-আর্য প্রাকৃতভিত্তিক কথ্য রূপ। পরবর্তীতে গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে গৌড়ীয় অপভ্রংশ এবং সেখান থেকে প্রাচীন বাংলা গড়ে ওঠে।
১৮৩৩ সালে প্রকাশিত গৌড়ীয় ব্যাকরণ গ্রন্থে রাজা রামমোহন রায় বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখান যে বাংলা ব্যাকরণ সংস্কৃতের অনুকরণ নয়; এর নিজস্ব ধ্বনি, রূপ ও বাক্যরীতি রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৮৫৫ সালে বর্ণপরিচয় গ্রন্থ রচনা করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালাকে যুক্তিসংগত ও সহজপাঠ্য রূপ দেন। তিনি সংস্কৃতনির্ভর জটিলতা কমিয়ে আধুনিক বাংলা লিপিকে সুসংহত করেন।
ভাষাবিদ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং গৌড়ীয় লিপিকেই বাংলা লিপির প্রাচীন রূপ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ভাষার যুগভিত্তিক বিবর্তন
প্রাচীন যুগ (২০০-১২০০ খ্রি.)
এই সময়ে গৌড়ীয় প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে প্রাচীন বাংলা গড়ে ওঠে। সমসাময়িক মাগধী প্রাকৃতের প্রভাবও ছিল। এ সময়ের প্রধান সাহিত্য নিদর্শন চর্যাপদ।
চর্যাপদের প্রথম পঙক্তি: “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল” আধুনিক অর্থ: শরীর বৃক্ষ, পাঁচটি তার ডাল।
মধ্যযুগ (১২০০-১৮০০ খ্রি.)
এই সময়ে বাংলা ব্যাকরণ মূলত সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রভাবে রচিত হয়। বিদ্যালয়শিক্ষায় সংস্কৃতজ্ঞানকে অপরিহার্য মনে করা হতো। ফলে বাংলা ব্যাকরণ অনেকাংশে সংস্কৃত কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রি.-বর্তমান)
এই যুগে বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ভাষার আদর্শ রূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার লাভ করলে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়।
ভাষা আন্দোলন ও বিশ্বস্বীকৃতি
বাংলা ভাষা বিশ্বের একমাত্র ভাষা যার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে মানুষ প্রাণ দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এবং ১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকায় ভাষার জন্য আত্মদান ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এর স্বীকৃতিস্বরূপ টঘঊঝঈঙ ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে।
উপসংহার
বাংলা ভাষার উৎপত্তি প্রাচীন ইন্দো-আর্য ধারা থেকে গৌড়ীয় প্রাকৃত ও অপভ্রংশ অতিক্রম করে মধ্যযুগে নিজস্ব রূপ পায় এবং আধুনিক যুগে পরিপূর্ণতা অর্জন করে। এটি একটি সমৃদ্ধ, পরিশীলিত ও বৈজ্ঞানিক ভাষা। ভাষা কখনও স্থির নয়; এটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়। তাই আমাদের দায়িত্ব এই ভাষার শিকড় জানা, তার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সমুন্নতভাবে তুলে ধরা।
সহায়ক পুস্তিকাদী ও অনলাইন ভিত্তিক রেফারেন্স: রাজা রামমোহন রায়ঃ ‘গৌড়ীয় ব্যাকরন’, ১৮৩৩ (বাংলা ১২৪৭), কলিকাতা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ১৮৪৭, কলিকাতা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ ‘বর্ণপরিচয়’, ১৮৫৫, কলিকাতা, শ্রীরজনীকান্ত গুপ্তঃ পাণিনি, ১৯৩৩, কলিকাতা, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহঃ ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’, প্রথম খণ্ড, ১৯৫৩, ঢাকা, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহঃ ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’, ১৯৬৫, ঢাকা, রজনীকান্ত চক্রবর্তীঃ গৌড়ের ইতিহাস, জানুয়ারী ১৯৯৯, কলিকাতা