• ঢাকা, বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:০৭ অপরাহ্ন
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisongbad.com

এক ফার্মাসিস্ট দিয়েই চলছে ৭০ হাজার মানুষের চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিবেদক
সর্বশেষ: সোমবার, ৪ আগস্ট, ২০২৫
এক ফার্মাসিস্ট দিয়েই চলছে ৭০ হাজার মানুষের চিকিৎসা
এক ফার্মাসিস্ট দিয়েই চলছে ৭০ হাজার মানুষের চিকিৎসা

Advertisements

আসিফ আলী (৩৫)। তিনি ছিলেন বাড়ির সবার বড়। তাই পরিবারের দায়িত্বও ছিলো তার উপরে। গত ২ আগস্ট বিষাক্ত সাপের কামড়ে আহত হয়। তার বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের চরের “৫২৩” গ্রামে। এই ইউনিয়নে আছে এক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সাপে কামড়ের পর তার পরিবারের সদস্যরা জানতেন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে কোনো লাভ নেই। তাই তারা দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রাণ রক্ষা করা যায়নি।

আসিফের বাবা রেজাউল করিম বলেন, ঘটনার দিন বাঁশঝাড়ের পাশে আমার ছেলে শুয়ে ছিলো। এরপর একটি সাপে তাকে কাটে। আমরা এর আগেও স্বাস্থ্য কমপেক্সে সম্পর্কে জানি যে তারা চিকিৎসা দিতে পারে না। তাই সময় নষ্ট না করে নৌকা নিয়ে আমার শহরে আসি। এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে সেখানে চিকিৎসক তাকে অক্সিজেন দেয়। এর কিছুক্ষণ পরই আসিফের মৃত্যু হয়।
তিনি আরো বলেন, এই চরে যদি একটি ক্লিনিক থাকতো। এখানে যদি মানুষ চিকিৎসা পেতো। ভালো ডাক্তার থাকতো। তাহলে আজ আমার আসিফ বেঁচে থাকতো।

আসিফের এই ঘটনা চরবাসীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। সামান্য জ্বর গর্ভকালীন জটিলতা কিংবা ইনফেকশন সব কিছুতেই নদী পার হয়ে রাজশাহী কিংবা গোদাগাড়ীতে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হয়।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন। পদ্মা নদীর ওপারে এই ইউনিয়ে ৭০ হাজার মানুষের বসবাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র হলো ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র। তবে সেখানে নেই কোন সেবা। এক ফার্মাসিস্ট দিয়েই হয় সব রোগীর চিকিৎসা। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছেন, দ্রুত তারা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পাশেই বিশাল মাঠ। সেই মাঠেই এক কোনে অবস্থিত এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি। চারপাশে আগাছা দেয়ালে ফাটল। ভবনের চারপাশে ঝোপঝাড় দেয়ালে বড় বড় ফাটল, ভেতরে অন্ধকার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চিহ্ন নেই। ভবনে প্রবেশ করতেই দেখা মিললো এক ফার্মাসিস্টের। তিনি ব্যতিত এখানে নেই ওষুধ, নেই চিকিৎসক ।
স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা খাতুন বলেন, শুনেছি এখানে নাকি বিভিন্ন ওষুধ দেওয়ার কথা তবে আজ পর্যন্ত কখনো যাইনি। দুইদিন গেছিলাম সেখান থেকে ঘুরে এসেছি কাউকে পাইনি। যদি জ্বর হয় তা নদী পার হয়ে গোদাগাড়ী যেতে হয়। এখানে শুধু নামেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কামে কিছুই না।

চর আষাড়িয়াদহের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মমিন বলেন, এখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের থাকার পরে সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় চাওয়া থেকে নদী পার করে নিয়ে যাবার সময় অনেক গর্ভবতী মায়েরা রাস্তায় মারা যায়। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। যেন বনের পশুর মত বসবাস করে। অসুস্থ হলে সুস্থ হতেও শহরে যেতে হয়। শুধু একটা নামে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখানে কোন কার্যকর ব্যবস্থা করা হয় না, কোন ওষুধ বা চিকিৎসা করা হয় না। যেসব ডাক্তার আছে তারা মাঝেমধ্যে আসে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ অসহায় নিরীহ তারা চিকিৎসা পায় না, এখানে শুধু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নামকরা হয়েছে কোন ওষুধ বা চিকিৎসা করা হয় না। যে সকল ডাক্তার বা নাইটগার্ড রয়েছে তারা শুধু বসে থেকে টাকা নেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহীল কাফি বলেন, আমাদের ন্যায্য অধিকার যেটা চিকিৎসা, সেটা আমরা পাইনা, আমাদের চরাঞ্চলের মানুষ সবসময় পিছিয়ে। শুধু একটা নদীর কারণে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ অন্ধকারে বসবাস করে। পড়াশোনা চিকিৎসা সবকিছু থেকেই দূরে আছে। সরকার থেকে যে মৌলিক অধিকার পাওয়া দরকার এ অঞ্চলের মানুষ সেগুলো পায় না। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যদি ইউনিয়নের মানুষের সেবা দিতে না পারে তাহলে কমপ্লেক্স রেখে লাভ কি? আমাদের মা-বোনদের পেটে ব্যথা হলেও তাদের নৌকা পার করে রাজশাহী বা গোদাগাড়ীতে নিয়ে যেতে হয়। যেখানে আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়ার কথা সেগুলো পাচ্ছিনা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরতদের অনুপস্থিতি ও দায়িত্বে অবহেলা প্রসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যার কথা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম (ভোলা) বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। রোগীরা ফিরে যায়। সমস্যাটা দীর্ঘদিনের।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্বরত একমাত্র ব্যক্তি ফার্মাসিস্ট রুহুল আমিন বলেন, আমাদের এখানে প্রথম সমস্যা যেটা হয় সেটা হলো স্টাফ সংকট। এখানে যে কয়জন জনবল থাকবে সেই পরিমাণ জনবল নাই। এখানে একজন মেডিকেল অফিসার, একজন ভিজিটর, একজন পিয়ন, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন নাইটগার্ড এর পোস্ট আছে। এখানে সবগুলোই ফাঁকা আছে, আমি শুধু ফার্মাসিস্ট হিসেবে আছি। জনবল নাই বললেই চলে। জানুয়ারি পর্যন্ত অল্প কিছু ওষুধ ছিল। তারপর ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট কোনো ওষুধ আসেনি।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোনো ওষুধ বা ডাক্তার আসে না। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কাজ ছিল, সেটাও ছয় মাস ধরে বন্ধ। মিটিংয়ে বললে বলে ওষুধ চলে আসবে। এখনো আসেনি। যত ওষুধ দরকার তার ১০% মানুষকেও কভার করা যায় না।

এবিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ এস.আইএম রাজিউল করিম বলেন, আমরা জানি চর আষাড়িয়াদহ একটি ইউনিয়ন, সেখানে কয়েকটি গ্রাম আছে। তাদেরও দাবি আছে সেখানে একটি ক্লিনিক করা হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের কোন স্থাপনা নেই। ফলে আমরা সেখানে চিকিৎসক পদায়ন ও ঔষুধ দিতে পারছি না। সেখানে যেটি আছে সেটি সিডাব্লু এর। তারা শুধুমাত্র মাতৃত্বকালীন কাজ করে।
তিনি আরো বলেন, আমরা এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে লিখেছি। দ্রুত সেখানে একটি স্থাপনার জন্য। এটি হয়ে গেলে আমরা সেখানে চিকিৎসক ও ঔষুধের সরবারহ করবো।


আরো খবর